কুলছুমের স্বপ্ন

By administrator on Feb 08 in Case Study.

কুলছুমের স্বপ্ন

বাংলাদেশ কৃষি প্রধান দেশ। কৃষির উপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছে আমাদের অর্থনীতি। আমাদের অর্থনীতি সমৃদ্ধ করার জন্য কৃষির পাশাপাশি বিভিন্ন আয়বর্ধক কার্যক্রমের ভুমিকাও অপরিসীম। এই কৃষি অর্থনীতি গড়ে উঠার পিছনে রয়েছে আমাদের নারী সমাজের অবদান। অথচ যুগ যুগ কাল থেকে আমাদের সমাজে নারীরা বিভিন্ন বঞ্চনার শিকার। এত বঞ্চনার পরেও তাঁরা সব সময় ঘুরে দাড়ানোর চেষ্টায় ব্রত রয়েছেন। সমাজে সম্পদশালীরা এসব মানুষের অভাবের সুযোগে তাঁদের ভিটে বাড়ীটুকুও কেড়ে নিতে দ্বিধাবোধ করেন না। এই দুর্নিবার প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখী হয়ে তাঁদের অনেকেই সমাজে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারেননি। এসব সীমাবদ্ধতার কারণে পারিবারিক ক্ষেত্রেও নারীর জীবনে নেমে এসেছে চরম দুর্দশা। এ সকল বাধা বিপত্তি উপেক্ষা করে নারীরা সমাজে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছেন। তেমনি এক নারীর নাম কুলসুম বেগম। কুলছুম বেগমের বয়স ৩০ বছর। তিনি শেরে বাংলানগর থানাধীন পশ্চিম আগারগাঁও, ১৪৭/বি-৯, দক্ষিন পিরেরবাগ মিরপুর, ঢাকা-১২১৬ বাসার একজন স্বচ্ছল গৃহিণী। বাবা মোঃ মিন্টু একজন শ্রমিক। মোঃ বাবুল নিজেও একজন শ্রমিক। খামারে কাজ করার পাশাপাশি বাবুল একজন সফল ব্যবসায়ী। একমাত্র ছেলেকে নিয়ে কুলছুম ও বাবুলের সুখের সংসার। কিন্তু আজকের এই পর্যায়ে আসতে তাঁদের প্রচুর কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে ।

২০০১ সালে মোঃ বাবুলের সাথে কুলছুমের বিয়ে হয়। তখন মোঃ বাবুল ভোলার শেরপুর গ্রামে পৈত্রিক ভিটায় তাঁর বাবা, মা ওা ভাইবোন নিয়ে একসাথে বসবাস করতেন। তাঁদের পারিবারিক অবস্থা খুব একটা ভাল ছিল না। তাঁর দুই ভাই অন্যের বাড়ীতে কাজ করতেন। অন্যের বাড়ীর কাজের পাশাপাশি অন্যের জমিও চাষ করে সামান্য পরিমাণ আয় করতেন। তাঁদের এই সামান্য আয়ে সংসার চলতো না। ধীরে ধীরে তাঁরা কিছু জমি ক্রয় করে তাতে চাষ করতে থাকেন। কিন্তু তাতেও পরিবারের আর্থিক অবস্থার খুব একটা পরিবর্তন হয়নি।

বাবুল তখনও অন্যের বাড়ীতে কাজ করতেন। অন্যদিকে, কুলছুমের বাবা মোঃ মিন্টুও অন্যের খামারে কাজ করতেন। তাঁদের পরিবারের অবস্থাও তেমন ভালো ছিল না। এরকম এক পরিবার থেকে বাবুলের অভাবের সংসারে এসে কুলছুম প্রথমে খেই হারিয়ে ফেলে। স্বামীর হাতেও তখন ভাল কোন ব্যবসা বা আয়বর্ধনশীল কর্মকান্ড শুরু করার মতো মূলধন ছিল না। অভাব তার যেন পিছুই ছাড়ছেনা। বাবার খামারে কাজ করা থেকে সে নিজে ধীরে ধীরে খামার করার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন।

বাবুল কুলছুমকে নিয়ে ঢাকায় চলে আসেন। এখানে এসে কুলছুম একটি গার্মেন্টস-এ চাকুরী শুরু করেন এবং দৈনিক বেতনের ভিত্তিতে বাবুল একটি গরুর খামারে চাকুরী নেন। সংসারের খরচ মিটিয়ে সে খুব একটা এগুতে পারেননি। অভাবের সংসারে স্বামী ও সন্তান নিয়ে কুলছুম চরম দুর্দশায় দিন কাটাতে থাকেন। কিন্তু এতসবের পরেও নিজের স্বামীকে সাহায্য করে সংসারের অর্থনৈতিক অবস্থা পরিবর্তন করার অদম্য ইচ্ছা কুলছুমকে কখনোই ভেঙ্গে পড়তে দেয়নি। কিছুদিন যাওয়ার পর সে ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ সালে আরবান-এর তালতলা শাখার ৩১ নং সমিতির ১৫ নং সদস্য হিসেবে ভর্তি হন এবং জাগরণ খাতের আওতায় বিশ হাজার টাকা ঋণ গ্রহণ করেন। এ ঋণের টাকা দিয়ে বাবুল নিজে ছোট একটি খালি জায়গা ভাড়া নেন এবং একটি গাভী ক্রয় করে খামার শুরু করেন। খালি জায়গা ভাড়া নেন এবং একটি গাভী ক্রয় করে খামার শুরু করেন।

এরপর আর তাঁদেরকে পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি। কিছুদিন পর কুলছুম গার্মেন্টেসের চাকুরী ছেড়ে দিয়ে আরবান থেকে সর্বশেষ ২০১৮ সালে অগ্রসর খাতের আওতায় ৬০,০০০/-(ষাট হাজার) টাকা ঋণ নিয়ে তাঁর স্বামীর গরুর খামার সম্প্রসারণে বিনিয়োগ করেন। বর্তমানে তাঁর খামারে ৮ টি গরু ও ৩ টি বাছুর রয়েছে। গরুগুলো অস্ট্রেলিয়ান, সংকর, শাহীওয়াল ও সিন্ধি প্রজাতির। গরুগুলো তিনি বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে সংগ্রহ করেন। গাভী লালন-পালনের পাশাপাশি তিনি কবুতর পালন শুরু করেন। কুলছুম খামারের গোবর দিয়ে কম্পোস্ট সার তৈরী করেন।
কুলছুম বেগম নিরাপদ ও প্রাকৃতিক উপায়ে গরু লালন-পালন করেন। গরুর খাবারের তালিকায় রয়েছে ভূষি, খড়, খইল, ধানের কুড়াসহ অন্যান্য জৈব উপাদান। কোন প্রকার রাসায়নিক বা ক্ষতিকর জিনিস তাঁর খামারে ব্যবহার করেন না। কুলছুমের খামারের দুধ সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের ধরণও সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক ও নিরাপদ। গরু থেকে প্রাপ্ত বর্জ্য পদার্থ নিয়মিত বিক্রি করে বাড়তি আয় করেন। কুলছুম বেগম খামারে দৈনিক গড়ে ১০০-১১০ কেজি দুধ উৎপাদিত হয়। তিনি দুধ স্থানীয়ভাবে বাসায় ও বড় বড় মিষ্টির দোকানে সরবরাহ করেন। দুধ ছাড়াও তিনি কবুতর পালন করে নিজেদের পুষ্টির চাহিদা
মিটিয়ে বাজারে বিক্রি করেন। বিভিন্ন সময় গরু ও কবুতরের বিভিন্ন অনাকাঙ্খিত রোগ বালাই দেখা দেয় কিন্তু কুলছুম বেগম দক্ষতার সাথে তা মোকাবেলা করেন। খামার উন্নয়নে ও গরুর রোগ-বালাই মোকাবেলায় নিয়মিত উপজেলা প্রাণিসম্পদ ও আরবান-এর কর্মকর্তাগণের পরামর্শ ও সহযোগিতা নেন এবং বিভিন্ন সময় বিভিন্ন প্রশিক্ষণে তাঁর স্বামী অংশগ্রহণ করেন। কুলছুম বেগম পরিবার, সমাজ ও দেশের দুগ্ধ ও পুষ্টি চাহিদা মেটাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। আশেপাশের অনেকেই কুলছুম বেগমের বর্তমান সাফল্য দেখে অনুপ্রাণিত হচ্ছেন। তাঁরাও এখন খামার করার চিন্তা-ভাবনা করছেন। কুলছুমের সংসারে এখন আর কোন অভাব-অনটন নেই। তাঁর একমাত্র ছেলে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে। কুলছুমের সামাজিক অবস্থানেরও অনেক পরিবর্তন হয়েছে। আশেপাশের লোকজন এখন তাঁদের অনেক সম্মান করে। ছেলে-মেয়েদের নিয়ে কুলছুমের অনেক স্বপ্ন, ছেলেমেয়েরা পড়াশোনা শেষ করে তাঁর ব্যবসাকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাবে। বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়বে তাঁর এই খামারের সুনাম। দুর্দিনে প্রকৃত বন্ধুর মতো পাশে দাঁড়ানোর জন্য কুলছুম আরবান-এর কাছে চির কৃতজ্ঞ।

administrator

Add Comment

Top